শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫
28 Feb 2025 10:08 am
![]() |
[গত ২৫ ফেব্রয়ারি'২৫ তারিখে বিডিআর বিদ্রোহে ১৬তম শহীদ সেনা দিবস পালিত হয়। ওইদিন এক স্মরণ সভায় সেনা প্রধান বলেন - একটি জিনিস আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে বিডিআর হত্যাকাণ্ড তৎকালীন বিডিআর জোয়ানরাই ঘটিয়েছে, আর কোনো কথা হবে না।.... আমি এই বর্বরতার চাক্ষুষ সাক্ষী। এই বর্বরতা কোনো সেনা সদস্য করে নি।.... এখানে কোনো ইফ এবং বাট নাই।
এখানে ইফ অথবা বাট আনা হলে, এই যে এতদিনকার বিচারিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে।..... এতদিন যারা সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, সেই প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে( বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৫ ফেব্রয়ারি'২৫)। তারপর তাঁর বক্তব্যটি এখন প্রধান আলোচ্য বিষয়। যদিও তিনি আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। আমি এ বিষয়ে একটি কলাম লিখেছিলাম। কলামটি ২০১০ সালের ২৫ ফেব্রয়ারি তারিখে বেশ কয়েকটি পত্রিকায় ছেপেছিল। লেখাটি পুণরায় প্রকাশ করা হলো ]
জনৈক গবেষক একটি কলামে শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে একজন মালীর উদাহরণ দিয়ে বলেন-'একজন মালী বেতনের বিনিময়ে একটি বাগানে নিযুক্ত থাকে। সে আইনত বাগানের মালিক নয়। কিন্তু পরোক্ষভাবে সে-ই মালিক। কারণ সে দক্ষ হাতে গাছগুলো পরিচর্যা করে। গাছগুলোকে যত্নআত্তি করতে করতে বাগানের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধের সৃষ্টি হয়। সেজন্য তার পেশাকে কোনোক্রমেই অবজ্ঞা করা উচিত নয়। তার বেতন-ভাতা যেন সন্তোষজনক ও ন্যায়সঙ্গত হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত'।
লেখাটি পড়ে একজন উগ্র মতাদর্শী বলে উঠেন- ' সমাজটি পাল্টিয়ে এমন সমাজ গড়তে হবে যেন ওই মালীই বাগানটির মালিক হয়'। ঠিক এমনিভাবে ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত শ্রেণীর দাবি পূরণতো হয়-ই না, উল্টো বহু অনাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে পড়ে। গত বছর ২৫ ও ২৬ ফ্রেব্রয়ারি বিডিআর-এর সদর দপ্তরে কতিপয় জোয়ান দাবি আদায়ের নামে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং নারকীয়ভাবে তাদের অফিসারদের হত্যা করে। এর ফলে দুঃখিনী বাংলার ইতিহাসে আরেকটি শোক দিবস যুক্ত হয়।
সেই বিদ্রোহে ৫৭ জন আর্মি অফিসার, ১ জন সৈনিক, ২ জন আর্মি অফিসারের স্ত্রী, ৭ জন বিডিআর সদস্য, ৪ জন সাধারণ নাগরিক তথা সর্বমোট ৭১ জন মানুষের প্রাণহানী ঘটে। বিদ্রোহ শুরুর দিন এবং পরদিন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এক শ্রেণীর রাজনীতিক-বুদ্ধিজীবীর মুখে অপরিনামদর্শী বক্তব্য শোনা গেছে। একজন বুদ্ধিজীবী কাম রাজনীতিক বলেন-' এরকম ঘটনা আশ্চর্যের কিছু নয়, এটা দীর্ঘকালের শোষণ-বঞ্চনার ফল।
এ সমাজ যে ভেঙে যাচ্ছে তার আলামত শুরু হয়েছে'। একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল বলেন-' এটা দীর্ঘকালের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ'। বিএনপি ঘরানার একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কাম বুদ্ধিজীবী( সাবেক ভিসি) ২৬ ফেব্রয়ারি এক পত্রিকায় লিখেছেন- ' এ ধরণের ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৫ সনের শেষের দিকে। এরই পরিণতি ছিল ৭ই নভেম্বর সিপাহি জনতার বিপ্লব। তখনো জওয়ানেরা ১২ দফা দাবিতে বিদ্রোহ করেছিলেন। তাদের অন্যতম দাবি ছিল সামরিক কর্মকর্তা ও জওয়ানদের মধ্যে সব পার্থক্য মুছে দিয়ে প্রত্যেকের কাজ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বেতন নির্ধারণ করা।... ... ... .... তখন কিন্তু যে আন্দোলনটি রচিত হয়েছিল তার ভিত্তি ছিল এক ধরণের আদর্শিক অঙ্গীকার। সেই আন্দোলনটি পরিচালিত হয়েছিল কয়েকজন খ্যাতনামা মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক। গঠিত হয়েছিল সৈনিক সংস্থা'। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে একটি ক্ষুদ্র ছাত্র সংগঠন চিকা মারে- ' বিডিআর বিদ্রোহের ইতিবাচক দিকটি ছড়িয়ে দিতে হবে সারা দেশে।' মিডিয়াগুলোও একই আচরণ করতে থাকে। কোনো মিডিয়াকেই প্রশ্ন করতে দেখা যায়নি যে, সেনা কর্মকর্তারা কোথায় আছে, কেমন আছে, তাদের বক্তব্যই বা কী! মিডিয়ার কারণেই সাধারণেরা ভাবতে শুরু করে-' জওয়ানেরা নিশ্চয়ই বৈষম্যের শিকার। তাদের বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত।'
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ভিন্ন মতও পাওয়া যায়, তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম ছিল। যেমন- একজন সেনা কর্মকর্তা বলেন- ' তাদের দাবি যৌক্তিক হতে পারে। কিন্তু আচরণ কখনই সমর্থনযোগ্য নয়।' কিন্তু ২৭ ফেব্রয়ারি যখন জানা গেল ওই বিদ্রোহে বহু সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, তখন তাদের সুর পাল্টে যায়। একক অভিনেতার মতো বলতে শুরু করেন- এ ঘটনা ১৯৭৫ সনের ৭ই নভেম্বরের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিছু বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা বাইরে থেকে কিছু লোক এনে সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল। কেউ বলেন- ' অধিকার আদায়ের নামে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড মেনে নেওয়া যায় না।' ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে উক্ত চিকা থেকে কে বা কারা ' ইতিবাচক' শব্দটি মুছে দেয়( শব্দটি মুছে দিয়ে তারা প্রমাণ করেছে এ জাতীয় বিশৃঙ্খল ঘটনায় কোনো ইতিবাচক দিক থাকে না)। ১৯৭৫ সনের ৭ই নভেম্বর তথাকথিত সিপাহি জনতার বিপ্লবের সময় একটি শ্লোগানকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তা হলো-' সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, অফিসারদের মাথা চাই '।
এ শ্লোগান প্রসঙ্গে এক সেমিনারে একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আমাকে বলেছেন- ' অফিসারদের মাথায় কি কোনো মগজ নেই, যে তাদের মাথা কেটে ফেলতে হবে? আসলে তারা মগজের গুরুত্ব না দিয়ে শক্তির মাধ্যমে কিছু একটা ঘটাতে চান'। মহাত্মা গান্ধী বলেছেন-' শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জিত জয় ক্ষণস্থায়ী ; তা আসলে পরাজয়েরই নামান্তর'।বিডিআর বিদ্রোহে নিহত ( চিকিৎসক) শহীদ বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হোসেনের স্ত্রী সাইদা সুলতানা " পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করা জরুরি" শিরোনামের একটি লেখায় যেসব তথ্য তুলে ধরেছেন তা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন- ' আমার এই লেখা তাদের জন্য যারা বিভিন্ন বৈষম্যের কথা বলে, ক্ষোভ ও অসন্তোষের কথা বলে, দাবি-দাওয়ার কথা বলে, মানবাধিকারের কথা বলে সময় সময় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে প্রকারান্তরে উসকানি দিয়ে ফেলেন।... ... ... মানবাধিকার কর্মীদের কাছে আমার প্রশ্ন মানবাধিকার শব্দটি বলতে আপনারা আসলে কী বুঝাতে চান? এর সঠিক সংজ্ঞাই বা কী?
আমার সঙ্গে আপনাদের মতের অমিল হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। কারণ আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, বিডিআরের সৈনিকদের ' মানব হিসেবে অধিকার ' সেদিনই লুন্ঠিত হয়েছে, যেদিন তাঁদের অধিকার সম্বন্ধে উদ্বুদ্ধ( উসকানি) করে তাদের দিয়ে নিজ হাতে নিজের প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করানো হয়েছে,... .... ..... বাংলাদেশের বহু সৈনিকের ছেলে মেজর জেনারেল হয়েছেন, প্রান্তিক কৃষকের ছেলে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হয়েছেন, হয়েছেন বড় আমলা ও শিক্ষক। আবার উল্টো চিত্রও আছে আমাদের চোখের সামনেই।... ... ... বৈষম্য, বঞ্চনা, অধিকারের মতো বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে গেলে নির্দিষ্ট পেশা, পরিস্থিতি সম্পর্কে ভালোভাবে জানা-বোঝা জরুরি ' ( প্রথম আলো ' ২১ জুলাই' ০৯)।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে চিনি, যিনি সর্বক্ষণ সমান হওয়ার কথা বলেন। একদিন তাঁর অফিসে গিয়ে মজার অভিজ্ঞতা হয়। তিনি তাঁর পিয়নকে ' এটা নয় ওটা আনো' বলে ধমকাতে থাকেন এবং পিয়নের নির্বুদ্ধিতা নিয়ে ব্যঙ্গ করতে থাকেন।ওই আচরণে তিনি নিজেই প্রমাণ করেছেন মানুষ সমান হয় না।মেধাগত বৈষম্যের কারণে পেশাগত বৈষম্য থাকে। তবে শ্রেণী বিভাজিত কর্মচারী ব্যবস্থাপনায় উর্দ্বতন অধস্তনকে তদারক করেন।তবে সমান ভাবার চেতনার ভাবনা থেকে বহু দুঃখজনক ভয়ংকর ঘটনা ঘটে যাওয়ার ঘটনা এদেশে রয়েছে। দার্শনিক বেঞ্জামিন ফ্রান্কলিন বলেছেন- মানুষের বিশ বছর চলে ইচ্ছার রাজত্ব,ত্রিশ বছর পর্যন্ত চলে বুদ্ধির রাজত্ব এবং চল্লিশ বছর পরে চলে বিচার-বিবেচনার রাজত্ব।সেজন্য রাষ্ট্রের সর্বস্তরে তথা কেন্দ্রে, বিভাগে, নগরে, জেলায়, উপজেলায় ও ইউনিয়নে গণতন্ত্র বাস্তবায়ন করতে হবে। তখন সহিংস পথে দাবি আদায়ের পথটি পরিত্যাজ্য হবে( দুঃখজনক হলেও সত্য যে, শাসককুল ও বিরোধীদল শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথটি সংকুচিত করে ফেলে( পুনশ্চঃ সামরিক আদালতে বিদ্রোহে জড়িত বিডিআর সদস্যদের বিচার চলছে।
চার্জশিট পাওয়ার পর সিভিল আদালতে হত্যাজনিত অপরাধে বিচার শুরু হবে। পত্রিকা সুত্রে জানা গেছে, বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৩৫ জন বিডিআর সদস্যসহ ৭ হাজারের বেশি লোককে জিজ্ঞাবাদ করা হয়েছে।গ্রেফতারকৃত জোয়ানদের মধ্যে নানা অসুখে ও আত্মহত্যা জনিত কারণে ৫৯ জন বিডিআর সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন 'আসক' এর মতে ৪০ জন বিডিআর সদস্য নির্যাতনে মারা গেছে।রিমান্ডের নামে নির্যাতন কখনোই সুবিচার নিশ্চিত করে না। সভ্য দুনিয়ায় বহু পুর্বেই চোখের বদলে চোখ এবং দাঁতের বদলে দাঁত তোলার নীতি পরিত্যাজ্য হয়েছে।
লেখক: গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ক গবেষক।