দেবী যশোরেশ্বরীর মন্দির নির্মাণ করেছিলেন রাজা প্রতাপাদিত্যের কাকা শ্রী বসন্ত রায়


উজ্জ্বল রায়, প্রতিনিধি:-দেবী যশোরেশ্বরীর মন্দির নির্মাণ করেছিলেন রাজা প্রতাপাদিত্যের কাকা শ্রী বসন্ত রায়। দেবী-যশোরেশ্বরী শক্তিপীঠের নাম-যশোরেশ্বরী। এই পীঠ বাংলাদেশের খুলনায়। 

 

হাসনাবাদ রেল স্টেশন থেকে ২৫ মাইল দূরে ঈশ্বরী পুরে। পীঠনির্ণয়তন্ত্র মতে এখানে দেবী সতীর হস্তের পাণিপদ্ম পড়েছিলো। পাণিপদ্ম কি? এটি কিন্তু দেহের কোনো অঙ্গ নয়, কিন্তু দেহের সাথে জড়িত। 

 

পাণি” শব্দের অর্থ হস্ত, পদ্ম একটি ফুল। অর্থাৎ দেবীর হাতের পদ্ম এখানে পতিত হয়েছিলো। দেখবেন দেবী হস্তে পদ্ম ধারন করেন। পদ্ম কোমলতা ও পূর্ণ বিকাশের প্রতীক। এখন প্রশ্ন দেবীর পদ্ম হতে কিভাবে দেবী সৃষ্টি হোলো ? পদ্ম ত জলজ পুস্প। উদাহরণ এই যে দক্ষ প্রজাপতির তপস্যায় তুষ্টা হয়ে আদ্যাশক্তি মহামায়া দক্ষ দুহিতা সতী রূপে জন্ম নিয়েছিলেন, দেবীর অঙ্গে নানা দেবীশক্তি বিদ্যামান ছিলো, দেবী যা ধারন করতেন তাতেও দেবীর শক্তি ছিলো সমভাবে বিদ্যামানা। 

 

সুতরাং দেবীর সেই করের পদ্মটিও একজন দেবী। পীঠনির্ণয়তন্ত্র তন্ত্র শাস্ত্রে লিখিত আছে-
যশোরে পাণিপদ্ম দেবতা যশোরেশ্বরী
চণ্ডশ্চ ভৈরবো যত্র তত্র সিদ্ধির্ণসংশয়।
 

দেবীর নাম যশোরেশ্বরী, তাঁর ভৈরব হলেন চণ্ড । দেবীকে এখানে সর্ব সিদ্ধিদায়িনী বলা আছে। যশ” প্রদানকারিণী মহাশক্তি তিনি। যশ শব্দের অর্থ কীর্তি । 

 

সকাম উপাসকেরা দেবীর কাছে আয়ু, আরোগ্য, সৌন্দর্য, টাকা, ধন, দৌলত, সুন্দরী স্ত্রী “রূপং দেহি যশ দেহি ভার্যাং দেহি ” বলে প্রার্থনা করেন । দেবী এই সকল যশ প্রদান করেন। আবার নিস্কাম উপাসকেরা চৈতন্য, আত্মজ্ঞান, মাতৃকৃপা, মাতৃ দর্শন ইত্যাদি যশ বা কীর্তি প্রার্থনা করেন, দেবী সেসকল কিছু প্রদান করেন । সেই জন্য দেবীর নাম যশোরেশ্বর। আর এই পীঠকে সর্ব সিদ্ধিদায়িনী বলে তন্ত্রে লিখিত হয়েছে । 

 

ঠিক এই কারনে সর্ব প্রকার বিকাশ বা অভ্যুত্থানের প্রতীক পদ্ম পুস্প দেবীর হস্ত থেকে এখানে পতিত হয়েছে । 
 

দয়াময়ী মায়ের কৃপা কতো । স্বেচ্ছায় নিজ দেহ থেকে ৫১ পীঠ সৃষ্টি করে মানব কল্যাণের জন্য বিরাজিতা হলেন । ভক্তি- শক্তি- মুক্তি মেলে দেবীর শক্তিপীঠে গিয়ে।
 

এই মন্দিরের প্রকাশ কিভাবে ঘটে ? বাংলার বার ভুইয়াদের রাজত্ব আমলের কথা। রাজা প্রতাপাদিত্যের এক বিশ্বস্ত অনুচর ছিলো। তাঁর নাম কমলখোঁজা। 

 

তিনি ইচ্ছামতী নদীর তীরে একদা ভ্রমণ কালে একটি জ্যোতি দেখতে পান। এরপর তিনি মহারাজাকে জানালে মহারাজ প্রতাপাদিত্য সেই বাদাবন পরিষ্কার করে দেবীর অঙ্গশিলা প্রাপ্তি করেন। ভিন্ন মতে যশ পাটনী নামক এক মাঝি নদীবক্ষে জ্যোতি দর্শন করেন। তিনি এই অলৌকিক কাণ্ড রাজা প্রতাপাদিত্যকে জানালে রাজা সেই স্থানে ডুবুরী নামিয়ে দেবী সতীর অঙ্গশিলা উদ্ধার করেন । এই ঘটনার পর রাজা প্রতাপাদিত্যের যশ বৃদ্ধি পায়। তিনি উৎকল আক্রমণ করে উৎকলেশ্বর শিব ও গোবিন্দ মূর্তি হরণ করে আনেন ও নিজ রাজ্যে মন্দির স্থাপনা করে প্রতিষ্ঠা করেন । 

 

অপরদিকে মুঘল শাসনকালে আকবরের নেতৃত্বে জয়পুরের রাজা মানসিংহ প্রতাপাদিত্যের রাজ্যে আক্রমণ করে দেবী সতীর অঙ্গশিলা জয়পুরে নিয়ে যান। সেখানেই এখন পূজা হয়। একটা প্রবাদ আছে না- হিন্দুই হিন্দুর বড় শত্রু”। 

 

রাজা প্রতাপাদিত্য যেমন হিন্দু রাজ্য উৎকল আক্রমণ করে অযথা হিন্দু হিন্দুর মধ্যে যুদ্ধ লাগালেন, আবার রাজা মানসিংহ তিনিও হিন্দু রাজ্য আক্রমণ করে অযথা হিন্দুদের মধ্যে রক্তপাত ঘটালেন। মাঝখান থেকে “লাভের গুড়” খেলো মুঘলেরা। 
 

দেবী যশোরেশ্বরীর মন্দির নির্মাণ করেছিলেন রাজা প্রতাপাদিত্যের কাকা শ্রী বসন্ত রায়। এই মন্দির অনেক পুরানো-দেখলেই বোঝা যায়। রাজার আমলে এই মন্দির নাকি প্রচুর কারুকার্যে শোভিত ছিলো । সেই সব চোখ ধাঁধানো কারুকার্য এখন আর নেই । সিমেন্টের আবরণের তলায় ঢাকা পরে গেছে। 

 

আশেপাশে রাজার নির্মিত যাত্রীনিবাস সেগুলিও এখন ধূলিসাৎ । স্থানীয় এক পুরোহিতের বাড়ীতে মায়ের শির আছে । স্থানীয় পুরোহিতের কথায় রাজা মানসিংহ নাকি নকল অঙ্গশিলা নিয়ে গেছিলেন।

 

যাই হোক এসকল বিতর্কিত বিষয়। স্থানীয় একঘর অধিকারী ব্রাহ্মণ বংশ পরম্পরা ধরে মন্দিরে পূজোর দায়িত্ব পালন করছেন । অতীতে নাকি এই মন্দিরে নরবলি হোতো। তন্ত্র মতে দেবীর পূজো হয়। দেবী এখানে কালী রূপিনী। এখন ছাগাদি বলি হয়। 
 

এই মন্দিরের সামনে একটি রাজার নির্মিত বাটি ছিলো। এক সময় দেবীর বিশাল সমারোহে পূজা হোতো। সেই বাটিতে বহু পাণ্ডা, পুরোহিত থাকতেন। এটাও এখন নেই। যশোর থেকে যশোরেশ্বরী যশোরের দক্ষিণে সাতক্ষীরা তে যেতে হবে। সাতক্ষীরা থেকে কালীগঞ্জ ৩৩ কিমি। সেখান থেকে শ্যামনগর হয়ে ২ কিমি দূরে বংশীপুর বাজার।

 

 সেখান থেকে অল্প দূরে এই মন্দির। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঢাকা যাওয়ার বাস আছে । ঢাকা থেকেও এই মন্দিরে যাওয়া যায় । এই হোলো মা যশোরেশ্বরীর কথা। আসুন মায়ের চরণে প্রনাম জানিয়ে বলি-
 

সহিতমহাহব মল্লমতল্লিক মল্লিতরল্লক মল্লরতে 
বিরচিত বল্লিক পল্লিক ঝিল্লিক ভিল্লিক বর্গবৃতে ।
সিতকৃতফুল্ল সমুল্লসিতারুণতল্লজ পল্লব সল্ললিতে 
জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনী রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ।।
 

অর্থাৎ- হে মাতঃ! তুমি জুঁইফুলের লতার মতো কোমল হয়েও বহুবিধ মল্লযুদ্ধ বিশারদ যোদ্ধার শক্তিকেও হার মানিয়েছো। কিন্তু তবু মধুমক্ষিকাকুলে সমাকীর্ণ জুঁইফুলে সুসজ্জিতা পল্লিবালার মতো সদ্যজাত ও ঈষৎলাভের কচিকচি পত্রপল্লব দ্বারা বেষ্টিতা মহানন্দে পরিপূর্ণা তুমি অতি সুন্দর । তুমি শৈলসুতা জটাজুটধারিণী পার্বতী। তুমিই মহিষাসুর বধ করেছো। উজ্জ্বল রায়, প্রতিনিধি।
 


প্রধান উপদেষ্টা সম্পাদকঃ মোঃ নুরুল ইসলাম ওমর, সাবেক এমপি ও বিরোধী দলীয় হুইপ, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ মাক্সুদুল আলম হাওলাদার

নির্বাহী সম্পাদকঃ এম নজরুল ইসলাম

ফোনঃ ০১৭১৭০১৬১৩০

যোগাযোগঃ অফিসঃ সাতমাথা, বগুড়া গাজীপুর অফিসঃ সিলমন, টঙ্গি, গাজীপুর

© 71 Vision ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

সতর্কতাঃ অনুমতি ব্যতীত কোন সংবাদ বা ছবি প্রকাশ বা ব্যবহার করা যাবে না।