কে এই ফাতেমা? বেগম খালেদা জিয়ার ১৬ বছরের নীরব ছায়াসঙ্গী


স্টাফ রিপোর্টার,বগুড়া :-রাজনীতির ইতিহাসে আমরা দেখি নেতা, আন্দোলন, ক্ষমতা ও কারাবরণের গল্প। কিন্তু এই ইতিহাসের আড়ালে থেকে যান কিছু নীরব মানুষ—যাদের কোনো রাজনৈতিক পদ নেই, নেই কোনো পরিচিতি; অথচ ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর নির্ভরযোগ্য সাক্ষী তারাই। তেমনই এক নীরব ছায়াসঙ্গীর নাম ফাতেমা বেগম—যিনি দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে আপোষহীন দেশনেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

ফাতেমা বেগমের জীবনকাহিনী, তার ত্যাগ ও অবদানের বিষয়টি বিশ্লেষণধর্মীভাবে তুলে ধরেন জিয়া সাংস্কৃতিক সংগঠন (জিসাস) বগুড়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এম-ট্যাব) আঞ্চলিক জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, সাবেক ছাত্রনেতা, বিশিষ্ট সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও সমাজসেবক মোঃ আরমান হোসেন ডলার।

ফাতেমা বেগমের জন্ম ভোলার সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের শাহ-মাদার গ্রামে। বাবা রফিকুল ইসলাম ও মা মালেকা বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। কৃষক হারুন লাহাড়ির সঙ্গে বিয়ের পর তাঁর সংসারে জন্ম নেয় এক কন্যা ও এক পুত্র। তবে ২০০৮ সালে স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে দুই শিশু সন্তান নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন তিনি। জীবিকার তাগিদে সন্তানদের গ্রামে রেখে কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসেন ফাতেমা।

 

২০০৯ সালে পূর্বপরিচয়ের সূত্রে তিনি বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবনে কাজের সুযোগ পান। সেখান থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ সহযাত্রা—যা কেবল চাকরির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং মানবিক সম্পর্কের এক গভীর বন্ধনে রূপ নেয়।

 

গুলশানের ‘ফিরোজা’, দলীয় কার্যালয়, রাজপথের আন্দোলন, দীর্ঘ অবরুদ্ধ সময়, কারাগারের নিঃসঙ্গ দিন কিংবা হাসপাতালের নির্ঘুম রাত—সবখানেই নীরবে উপস্থিত ছিলেন ফাতেমা। চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর দায়িত্ব কেবল গৃহকর্মীর ছিল না; বরং ওষুধ খাওয়ানো, শারীরিক দুর্বলতায় হাত ধরে রাখা, সময়মতো প্রয়োজনীয় বিষয় স্মরণ করিয়ে দেওয়া—সবই ছিল তাঁর নীরব দায়িত্বের অংশ।

 

২০১৪ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির সময় প্রথমবার ফাতেমা বেগম জনদৃষ্টিতে আসেন। 

গুলশানের বাসভবনের সামনে পুলিশের বাধায় বের হতে না পেরে সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য দেওয়ার সময় শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া খালেদা জিয়াকে শক্ত করে ধরে রাখার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়। সেই মানবিক মুহূর্তে তিনি আলোচনায় আসেন।

 

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে আইনজীবীদের আবেদনের পর আদালতের অনুমতিতে গৃহকর্মী হিসেবে ফাতেমা তাঁর সঙ্গে কারাগারে যান। রাজনৈতিক কোনো পরিচয় ছাড়াই স্বেচ্ছায় প্রায় ৭৭৮ দিন কারাভোগ করেন তিনি। ওই সময় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বক্তব্যে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘কারাগারেও তাঁর ফাতেমাকে লাগবে’।

 

২০২১ সালে করোনা আক্রান্ত হয়ে বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ ৫৩ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালে, যখন স্বজনরাও দূরে থাকতে ভয় পাচ্ছিল, তখন ফাতেমা ছিলেন নির্ভীক সেবিকা হিসেবে পাশে। সর্বশেষ উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থানকালেও তিনি ছিলেন সার্বক্ষণিক সঙ্গী।

 

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর শেষ সময় পর্যন্ত এভারকেয়ার হাসপাতালে পাশে ছিলেন ফাতেমা। দাফনের দিন কফিনের সঙ্গে হেঁটে কবর পর্যন্ত গিয়ে শেষ বিদায়ের সব আনুষ্ঠানিকতায় নীরবে অংশ নেন তিনি। কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, নেত্রীর প্রয়াণে সবচেয়ে ভেঙে পড়া মানুষগুলোর একজন ছিলেন ফাতেমা বেগম।

 

এদিকে ফাতেমাকে ‘বোন’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, “আমার মা দীর্ঘ সময় একা ছিলেন, তখন ছায়ার মতো আগলে রেখেছিলেন ফাতেমা। মায়ের কারাবাসের সময় স্বেচ্ছায় জেলে যাওয়ার আবেদন করে তিনি আমাদের সবাইকে বিস্মিত করেছিলেন।”

 

তারেক রহমান আরও জানান, আইনি প্রক্রিয়ায় ফাতেমাকে দত্তক নিয়ে তাঁকে বোনের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এবং জিয়া পরিবারের সম্পত্তিতে তাঁর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে দেশবাসী ও বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান, ফাতেমাকে নিজের বোনের সম্মান দেওয়ার জন্য।

 

এই সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অনেকেই একে ‘ত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞতার বিরল উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। বিশিষ্টজনরা বলছেন, রাজনীতির আড়ালে থাকা নীরব ত্যাগীদের স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

 

দীর্ঘদিন ধরে যারা জিয়া পরিবারের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, তারা মনে করছেন ফাতেমার এই স্বীকৃতি দলের কর্মীদের ত্যাগের প্রতি নেতার মমত্ববোধেরই বহিঃপ্রকাশ।

 

রাজনীতির ইতিহাসে হয়তো ফাতেমা বেগম কোনো নেতা নন, কোনো পদধারী নন—তবু আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের কঠিন সময়গুলোর নীরব ছায়াসঙ্গী হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাসে অমলিন হয়ে রবে।।


প্রধান উপদেষ্টা সম্পাদকঃ মোঃ নুরুল ইসলাম ওমর, সাবেক এমপি ও বিরোধী দলীয় হুইপ, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ মাক্সুদুল আলম হাওলাদার

নির্বাহী সম্পাদকঃ এম নজরুল ইসলাম

ফোনঃ ০১৭১৭০১৬১৩০

যোগাযোগঃ অফিসঃ সাতমাথা, বগুড়া গাজীপুর অফিসঃ সিলমন, টঙ্গি, গাজীপুর

© 71 Vision ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

সতর্কতাঃ অনুমতি ব্যতীত কোন সংবাদ বা ছবি প্রকাশ বা ব্যবহার করা যাবে না।